vidyasagar university road:nail sticks in the tree on west bengal medinipur vidyasagar university road trees | মেদিনীপুরে পেরেকে বিদ্ধ গাছের সারি, উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা

0
19


সমীর মণ্ডল, মেদিনীপুর

মেয়েকে কোথায় ভর্তি করবেন অথবা কোথায় নার্সিং ট্রেনিং নেওয়ার সুযোগ আছে? গাছের দিকে তাকান, জেনে যাবেন। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের সম্পূর্ণ ঘরোয়া পরিবেশে থাকা-খাওয়া ও নিরাপত্তার ঠিকানার হদিসও পেয়ে যাবেন গাছেই। ভাবছেন, সে আবার কী? মেদিনীপুর শহরে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় রোড ধরে এগলেই টের পাওয়া যাবে। রাস্তার দু’ধারে আম, জাম, খেজুর, শিরিষ, অর্জুন, নিম, তেঁতুল, ইউক্যালিপটাস, বট, অশ্বত্থ, সেগুন, বৈচিত্র্যের শেষ নেই। কিন্তু সব গাছই কার্যত ঢাকা পড়েছে সাইনবোর্ড কিংবা ফ্লেক্সে। পেইং গেস্ট থেকে শুরু করে প্রাইভেট টিউটর, গান বা বাদ্যযন্ত্র শিক্ষার স্কুল কিংবা নার্সিং প্রশিক্ষণের ঠিকানা, ফোন নম্বর জানিয়ে দিচ্ছে বোর্ডগুলি। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় রোড নয়, মেদিনীপুর শহর জুড়েই বড় বড় গাছের কাণ্ডে পেরেক ঠুকে নিখরচায় চলছে বিজ্ঞাপন। ক্ষতি কী? বিশেষজ্ঞরা কিন্তু বলছেন, মারাত্মক প্রভাব। বাস্তবে গাছকেই মেরে ফেলার প্রক্রিয়া হল গাছের গায়ে পেরেক ঠোকা।

যত বেশি পেরেক পোঁতা হচ্ছে, তত সর্বনাশ হচ্ছে সেই গাছটির। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক অমলকুমার মন্ডল বলেন, ‘পেরেক পুঁতলে গাছের জল ও খাদ্য পরিবহণকারী জাইলেম ও ফ্লোয়েম কলা নষ্ট হতে পারে। এর ফলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা নির্ভর করে পেরেক কতটা গাছের গভীরে ঠুকে দেওয়া হচ্ছে, তার উপর। এর প্রভাব পড়বে বাস্তুতন্ত্রে।’ তরুণ গবেষক অনুপকুমার ভুঁইয়া বলেন, ‘পেরেক পুঁতলে গাছের ‘ফাঙ্গাল ইনফেকশন’ হতে পারে। এর ফলে গাছের কোষ নষ্ট হয় ও বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।’ অথচ দিন দিন বাড়ছে পেরেক বিদ্ধ গাছের সংখ্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফল একদিন না একদিন ভোগ করতেই হবে। যাদের এ ব্যাপারে নজরদারি করার কথা, তাদের কিন্তু হেলদোলই নেই। বন দপ্তর সমস্যাটি নিয়ে কখনও প্রচারই করে না।

মেদিনীপুরের বিভাগীয় বনাধিকারিক রবীন্দ্রনাথ সাহা বলেন, ‘সত্যিই আমরা এ নিয়ে তেমন ভাবে কোনদিন প্রচার করিনি। কিন্তু দিনে দিনে যেভাবে গাছে বিজ্ঞাপনের বোর্ড লাগানোর প্রবণতা বাড়ছে, তাতে আমাদের চিন্তা ভাবনা করতে হবে। আইনে আমরা কিছু করতে পারি না ঠিকই, কিন্তু দায় আমরা এড়াতে পারি না।’ শহর এলাকায় সমস্ত হোর্ডিং, সাইনবোর্ড ইত্যাদি টাঙানোর জন্য ট্যাক্স নিয়ে থাকে পুরসভা। তাহলে ট্যাক্স দিলে কেউ গাছে পেরেক ঠুকে বোর্ড লাগাতে পারে? মেদিনীপুরের পুরপ্রধান প্রণব বসুর বক্তব্য, ‘এমন ঘটনা নজরে এলে আমরা সেই বোর্ড খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করি। বিজ্ঞাপন সংস্থাকেও খুলে নিতে বলি, সতর্ক করি।’ কিন্তু কেউ কথা না-মানলে? পুরপ্রধান বলেন, ‘জরিমানার ব্যবস্থা তো আছেই।’ কিন্তু তেমন জরিমানা কাউকে দিতে হয়েছে বলে খবর মেলেনি। পুলিশও নাকি অসহায়।

পশ্চিম মেদিনীপুরের অলোক রাজোরিয়া বলেন, ‘আমরা সরাসরি এই বিষয়ে কিছু করতে পারি না। বিষয়টি পঞ্চায়েত ও পুরসভা দেখভাল করে। নির্দিষ্ট অভিযোগ এলে অবশ্যই আমরা দেখি।’ অভিযোগ না-করলে দেখার কেউ নেই। কিন্তু তাতে কত বড় সর্বনাশ হচ্ছে, তার ইঙ্গিত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুগোল এবং পরিবেশ বিভাগের শিক্ষক রামকৃষ্ণ মাইতি বলেন, ‘সস্তায় বিজ্ঞাপন দিতে গিয়ে অনেকে অজান্তে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করে ফেলছেন, যার ফল ভবিষ্যতে আমাদের পেতে হবে। কেননা, বর্তমানে গাছ ছাড়া আমাদের পরিবেশ রক্ষা করার আর কেউ নেই। অনেক দেশ সেটা টের পাচ্ছেন এখনই। তাই আমাদের সচেতনতা দরকার।’ পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত বলেন, ‘অনেক বছর আগে এই নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা করেছিলাম। সমস্ত দিক দেখে গাছে এ ভাবে বিজ্ঞাপন দেওয়া নিষিদ্ধ করে উচ্চ আদালত। তার পরেও চলছে এই কাজ। বন বা পরিবেশ দপ্তর কিংবা পুলিশ, কেউ এর দায় এড়াতে পারে না।’

রাজা নরেন্দ্রলাল খান মহিলা মহাবিদ্যালয়ের ভুগোল বিভাগের অধ্যাপক প্রভাতকুমার শীট বলেন, মেদিনীপুর শহরে এই ধরনের বিজ্ঞাপনে ভরে গেলেও কারও কোনও হেলদোল নেই।’

এই সময়ের মত

সমাজের সর্ব স্তরে পরিবেশ সচেতনতা গড়ে না উঠলে, গাছে পেরেক ঠুকে বিজ্ঞাপন লাগানোর প্রবণতা কখনই কমবে না। কিন্তু এই মানসিকতায় বদল আনার দায় প্রশাসনের একার নয়। প্রতিটি পরিবারে, স্কুলে, অল্প বয়স থেকেই পরিবেশ রক্ষার পাঠ দেওয়া উচিত। ‘একটি গাছ, একটি প্রাণ’ এ বার থেকে লেখা হোক জীবনখাতার প্রতি পাতায়।





Source link

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here